Savapotir Vason

সভাপতির ভাষণ
আজ ১ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১৯ মাঘ ১৪১৮ ষড়্বিংশতিতম জাতীয় কবিতা উৎসবের উদ্বোধন ঘোষিত হ’ল। সম্মানিত উদ্বোধক — বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান লেখক সৈয়দ শামসুল হক, দেশ ও বিদেশের প্রিয় কবিবৃন্দ, কবিতা পরিষদের নেতৃবৃন্দ, কবিতাপ্রেমী সুধীজন — আপনারা আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন গ্রহণ করুন।

কবিতা উৎসবের সমস্ত গৌরবের সঙ্গে মিশে আছে বায়ান্নোর অমর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ঊনিশশ’ সাতাশি সাল পরবর্তী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলনে, অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একাতœ হ’য়ে আছে জাতীয় কবিতা পরিষদের সত্তা। এই মাহেন্দ্রক্ষণে রক্তদাগ স্পর্শ করে দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গকৃত সেইসব বীর শহীদদের অবনত শিরে স্মরণ করি। স্মরণ করি সেই মহামানবকে যাঁরা প্রতিটি রক্তবিন্দু মিশে আছে এ দেশের জীবনে ও জড়ে।

বাংলাদেশ এবং বাংলাভাষা যেমন হৃদয়ে ও জিহ্বায় সমার্থক তেমনি কবিতা এবং বাঙালি দুই চোখের মিলিত এক ধারা। এ ধারায় যুক্ত হ’য়ে আছে যাপনের ক্রান্তি, উত্তরণের সংকট এবং অবগাহনের আনন্দ। বেদনার আনন্দ-নাম কবিতা, আর প্রেমের শুদ্ধ বানান কবিতা। কবিতার অলৌকিক আবাহনের মধ্যে দিয়ে আজ আমরা মিলিত হচ্ছি এ উৎসবে, ছাব্বিশ বছরের সাফল্য-বিহারে।

কবিতার সঙ্গে-সঙ্গে চলে সময়, দুঃসময়ও বুঝি তার পিছু ছাড়ে না। সংকট ও সংশয়, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা, অনিষ্ঠ ও অর্থ, দম্ভ ও দখল আজ কবিতার বড়ো শত্রু। অসম্পূর্ণ সীমার মধ্যে পিষ্ট হচ্ছে কবিতার শুদ্ধ শরীর। দুষ্টের দখলে চলে যাচ্ছে পবিত্রতম ভাষা। শ্রী ও শালীনতা অবজ্ঞা ও অসম্মানে পদদলিত হচ্ছে। যৌবনের মন্ত্র এবং জীবনের দাবী যখন রাহুর কবলে পড়ে তখন উদ্ধারের জন্য চাই ব্রহ্মাস্ত্র। কবিতা কি সে ভার নিতে পারে ? নিশ্চয়ই পারে। একজন কবির স্বপ্নই দিতে পারে বাঁচার সরল মানে, মানুষের প্রকৃত অর্থ।

বিষয়-ভাবনায় কবিতার আবেদন কতোটুকু বা শিল্পিত ভূমিকা কি ? সংশয় ও সংকটের এই কালে — কবিতার কোনো সুনির্দিষ্ট আবর্ত কি নেই ? সঙ্গীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নৃত্য, অভিনয় থেকে খাদ্যান্বেষণ কী প্রজনন পর্যন্ত সবকিছুর অন্তর-চিত্রে কবিতার শিকড় চারিত। বিলুপ্তির সঙ্গে অস্তিত্ব মিলিয়ে কবিতা তার ভাবরূপ, কথ্যরূপ, শ্রবণরূপ, লেখ্যরূপ ও চিত্ররূপে বিদ্যমান। কৃষক-বণিক কিংবা বারবালা-সৈনিক কোনো না কোনো ক্ষেত্ররেখায় কবিতাসীমানা প্রদক্ষিণ করে। মানুষের বিচিত্র চিন্তা ও বহুমুখিনতাই তার চরিত্রকে দ্বন্দ্বময় করেছে। অর্থ, কীর্তির বাইরেও এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ সারাক্ষণ ওঁত পেতে আছে। এই ‘বিপন্ন বিস্ময়’ কি কবিতা নয় ? লাঙ্গলের ফলায়, আগুন-লোহায়, বিষের শিশিতে, আলো-অন্ধকারে, শূন্যে-পাতালে, মালিন্যে-প্রফুল্লতায়, মৃত্যু ও জন্মে কবিতার মার্বেলগুলো গড়াগড়ি খাচ্ছে। কবিতা শোনিতে, স্বপ্নের ধ্বনিতে। কবি হচ্ছেন অতীত ও ভবিষ্যতের পাহারাদার; নির্মম ও অনুরাগী।