Ghosna Patra

ঘোষণাপত্র
কবি ও কবিতার সংগ্রাম মানুষের মুক্তির সংগ্রামের সহযাত্রী। আদিকাল থেকেই সমাজের কাছে দায়বদ্ধ কবিতা মানুষের চর্চায়, অনুশীলনে ও ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়ে আসছে পৃথিবীর সর্বপ্রান্তব্যাপী। জন্মলগ্ন থেকে বাংলা কবিতা মূলত একই ধারায় প্রবহমান। এ কারণেই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই—এই অমর কবিতার স্রষ্টা, মানবপ্র্রেমিক কবি চণ্ডীদাসের কাছে রাজসভার কবি বিদ্যাপতির মস্তক অবনত ছিল বিনম্র শ্রদ্ধায়। তাই, কবিতা সৃষ্টি করা এবং কবিতা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কবির এক প্রধান কাজ—তা পরোক্ষে কিম্বা প্রত্যক্ষে। এভাবেই, কবি ও কবিতা সব ভেদরেখা অতিক্রম করে, সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বেদনায় ও সংকটে-সংগ্রামে আপন হয়ে ওঠে সকল দেশের, সকল কালের মানুষের কাছে। আর এমনি করেই বাংলা ভাষার কবিদের ন্যায়বোধ, দেশপ্রেম ও মানবতাবাদী সৃষ্টিকর্ম এবং জীবন-দর্শন আমাদের চলার পথের পাথেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উনিশ’শ পঁচাত্তরে সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা, আত্মদান ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ সামরিক বুটের তলায় পিষ্ট হতে থাকে। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়ার প্রত্যক্ষ মদদে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির ভয়ঙ্কর উত্থান ঘটে। মাতৃভুমির এহেন দুঃসময়ে, বিশেষত নব্বইয়ের দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনকালে, বাংলাদেশের কবিরা সকল ভয়-ভীতি-রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, শৃঙ্খল মুক্তির ডাক দিয়ে জাতীয় কবিতা উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে তীব্র ও বেগবান করে। কবিতা উৎসব প্রাঙ্গন তখন সমস্ত প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের নেতা-কর্মীসহ গণতন্ত্রকামী সর্বস্তরের মানুষের প্রতিবাদী সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়; সারা বাংলার নবীন-প্রবীণ কবিদের প্রবল পরাক্রান্ত কণ্ঠস্বর সামরিক শাসনের মূলোৎপাটনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং দেশ দীর্ঘ সামরিক শাসনের বর্বরতা থেকে মুক্তি লাভ করে। এতদসত্বেও আমাদের কাক্সিক্ষত গণতন্ত্রের পথ নিষ্কণ্টক করা সম্ভব হয় নাই। বরং সামরিক-অসামরিক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যুদ্ধাপরাধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার করে তৎকালীন বিরোধী দলের ওপর নজিরবিহীন নিপীড়ন, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যা ও ধর্মীয় উগ্রজঙ্গিবাদী সন্ত্রাস ছড়িয়ে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তবে আমাদের সৌভাগ্য এই যে, কৃষক-শ্রমিক-পেশাজীবী ও ছাত্র-জনতার অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের ফলে নানা রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশ আজ গণতন্ত্রের পথে অগ্রসরমান।

বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল রেখে বাংলাদেশ এখন ঘুরে দাঁড়াবার জন্যে প্রাণপণ প্রচেষ্টাপর। সারা দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থায় তথ্য-প্রযুক্তির বিস্তার; আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপ্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার; অব্যাহত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিনিময়; মানবসম্পদের বিদেশে কর্মসংস্থান; এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সুনাম আমাদের উত্তরোত্তর অগ্রগতি ও উন্নয়নের উজ্জল দৃষ্টান্ত।
আমরা কবিরা, মানব-মানবী-প্রেম-প্রকৃতি বন্দনার পাশাপাশি, রক্তমূল্যে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির সংকটকালে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচার, জঙ্গীবাদ দমন, সেনা অভ্যুত্থানের বিষদাঁত গুড়িয়ে দেয়ার বিক্রম, সংখ্যালঘু-আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আকাক্সক্ষায় শিল্পসুষমামণ্ডিত কবিতা সৃষ্টি করছি, স্বপ্ন রচনা করে চলছি প্রতিদিন। এই ছাব্বিশতম জাতীয় কবিতা উৎসবে দাঁড়িয়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্দি করছি যে, আমাদের চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। আমাদের পথে পথে পাথর ছড়ানো। তাই, আমরা দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করি—কবি ও কবিতার সংগ্রাম চলবেই। আমাদের ধমনীতে চণ্ডীদাস, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমানের শোণিত প্রবাহিত; আমাদের চোখে ন্যায় শান্তি প্রগতি ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের আকাশ সমান স্বপ্ন। কবিদের পুণ্য শোণিত আপনাদের সকলের ধমনীতে নতুন শক্তির সঞ্চার করুক, কবিদের সুন্দর স্বপ্ন সকলের চোখে উদ্ভাসিত হয়ে আমাদের প্রিয় পৃথিবী শান্তিময় ও সমৃদ্ধ হোক।

জয় কবিতার। জয় মানবতার।

মুহাম্মদ সামাদ
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য
জাতীয় কবিতা পরিষদ